ব্লকচেইন (Blockchain) কী? সহজ ভাষায় ক্রিপ্টোকারেন্সির পেছনের প্রযুক্তি
গত কয়েক বছর ধরে ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দগুলোর মধ্যে একটি হলো 'বিটকয়েন' (Bitcoin) বা ক্রিপ্টোকারেন্সি। আর এই বিটকয়েনের নাম আসলেই অবধারিতভাবে যে প্রযুক্তিটির নাম চলে আসে, তা হলো 'ব্লকচেইন' (Blockchain)। অনেকেই মনে করেন ব্লকচেইন এবং বিটকয়েন হয়তো একই জিনিস। কিন্তু বাস্তবে ব্লকচেইন হলো একটি বিশাল এবং যুগান্তকারী প্রযুক্তি, আর বিটকয়েন হলো সেই প্রযুক্তির ওপরে তৈরি করা একটি ছোট অ্যাপ্লিকেশন মাত্র।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯০ এর দশকে 'ইন্টারনেট' আবিষ্কার হওয়ার পর মানুষের জীবন যতটা বদলে গিয়েছিল, আগামী কয়েক দশকে 'ব্লকচেইন' প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে ঠিক ততটাই বদলে দিতে যাচ্ছে। ব্যাংক থেকে শুরু করে জমি কেনাবেচা, ভোট প্রদান এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা— সবকিছুই চলে আসবে ব্লকচেইনের আওতায়। তখন কোনো দুর্নীতি বা জালিয়াতি করা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আজকের এই চমৎকার এবং তথ্যবহুল আর্টিকেলে আমরা কোনো জটিল টেকনিক্যাল শব্দ ব্যবহার না করে একদম সহজ ভাষায় আলোচনা করবো ব্লকচেইন (Blockchain) কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং কেন একে হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব। চলুন, ভবিষ্যতের এই প্রযুক্তির জাদুকরী দুনিয়ায় প্রবেশ করা যাক।
পেজ সূচিপত্রঃ ব্লকচেইন গাইড
- ব্লকচেইন (Blockchain) কী? (সহজ উদাহরণ)
- ব্লকচেইন কীভাবে কাজ করে?
- ব্লকচেইন কেন এত বেশি নিরাপদ? হ্যাক করা কি সম্ভব?
- ব্লকচেইনের বাস্তব ব্যবহার (ভবিষ্যতের পৃথিবী)
- ব্লকচেইনের সুবিধা এবং অসুবিধা
- শেষ কথা
ব্লকচেইন (Blockchain) কী? (সহজ উদাহরণ)
শব্দটিকে ভাঙলে আমরা দুটি অংশ পাই: Block (ব্লক) এবং Chain (চেইন বা শিকল)। অর্থাৎ, অনেকগুলো ডিজিটাল ডেটার ব্লককে যখন একটি চেইন বা শিকলের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত করা হয়, তখন তাকে ব্লকচেইন বলা হয়। প্রযুক্তিগত ভাষায়, ব্লকচেইন হলো একটি ডিস্ট্রিবিউটেড ডিজিটাল লেজার (Distributed Digital Ledger) বা বিকেন্দ্রীকৃত ডিজিটাল খাতা।
খুব কঠিন মনে হচ্ছে? চলুন একটি সহজ বাস্তব উদাহরণের সাহায্যে বোঝা যাক।
ধরুন, আপনি এমএস ওয়ার্ডে (Microsoft Word) একটি দলিল লিখে আপনার ৫ জন বন্ধুকে ইমেইল করে পাঠালেন। এখন আপনার কোনো এক বন্ধু চাইলে সেই দলিলের লেখাগুলো এডিট করে বা পরিবর্তন করে নিজের মতো করে সেভ করে রাখতে পারে। আপনি সেটা জানতেও পারবেন না।
কিন্তু আপনি যদি লেখাটি গুগল ডক্সে (Google Docs) লিখে লিংকটি সবার সাথে শেয়ার করেন, তবে কী হবে? ওই ৫ জন বন্ধু একই সময়ে একই ডকুমেন্টে দেখতে পাবে। কেউ যদি ওই ডকুমেন্টের একটি কমা (,) ও পরিবর্তন করে, তবে সাথে সাথে বাকি ৫ জনের স্ক্রিনেও সেটি আপডেট হয়ে যাবে এবং সবাই দেখতে পাবে কে পরিবর্তনটি করেছে।
ব্লকচেইন ঠিক গুগল ডক্সের মতোই কাজ করে। এটি হলো এমন একটি ডিজিটাল খাতা (Ledger), যা ইন্টারনেটে যুক্ত থাকা লাখ লাখ কম্পিউটারের কাছে একই সাথে কপি করা থাকে। কেউ যদি খাতার কোনো একটি পাতায় (Block) থাকা ডেটা বা টাকার হিসাব পরিবর্তন করার চেষ্টা করে, তবে সাথে সাথে নেটওয়ার্কের লাখ লাখ কম্পিউটারের কাছে নোটিফিকেশন চলে যাবে এবং তারা সেই ভুয়া পরিবর্তনটি বাতিল করে দেবে। ফলে ব্লকচেইনের ডেটা কখনোই চুরি, পরিবর্তন বা ডিলিট করা সম্ভব হয় না।
ব্লকচেইন কীভাবে কাজ করে?
একটি ব্লকচেইনের ভেতরে থাকা প্রতিটি ব্লকে মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস থাকে:
১. ডেটা (Data):
ব্লকচেইন কীসের ওপর তৈরি, তার ওপর নির্ভর করে এই ডেটা। যেমন- বিটকয়েনের ক্ষেত্রে ব্লকের ভেতরে লেখা থাকে কে কাকে কত টাকা পাঠিয়েছে (যেমন: রহিম করিমকে ৫ বিটকয়েন পাঠালো)। আবার এটি যদি হাসপাতালের ব্লকচেইন হয়, তবে রোগীর নাম, বয়স এবং রিপোর্টের ডেটা থাকবে।
২. হ্যাশ (Hash):
হ্যাশ হলো মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপের মতো। প্রতিটি ব্লকের একটি ইউনিক বা অদ্বিতীয় হ্যাশ থাকে (যেমন- a3b9x2...)। ব্লকের ভেতরের ডেটা সামান্য পরিবর্তন করলেই এই হ্যাশ সম্পূর্ণ বদলে যায়। তাই কেউ ডেটা হ্যাক করার চেষ্টা করলেই হ্যাশ পরিবর্তন হয়ে সবাইকে সতর্ক করে দেয়।
৩. পূর্ববর্তী ব্লকের হ্যাশ (Previous Hash):
এটিই ব্লকচেইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধরুন, চেইনে ৩টি ব্লক আছে। ২ নম্বর ব্লকের ভেতরে তার নিজের হ্যাশের পাশাপাশি ১ নম্বর ব্লকের হ্যাশও লেখা থাকে। আবার ৩ নম্বর ব্লকের ভেতরে ২ নম্বর ব্লকের হ্যাশ লেখা থাকে। এভাবেই একটার সাথে আরেকটা ব্লক শিকলের মতো যুক্ত থাকে।
কীভাবে ট্রানজেকশন হয়? (Nodes & Decentralization):
যখনই কেউ নতুন একটি লেনদেন করে, তখন একটি নতুন 'ব্লক' তৈরি হয়। কিন্তু এটি সরাসরি চেইনে যুক্ত হয় না। এটি প্রথমে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা লাখ লাখ কম্পিউটারের (যাদের নোড বা মাইনার বলা হয়) কাছে যায়। মাইনাররা তাদের কম্পিউটারের শক্তি ব্যবহার করে জটিল গাণিতিক হিসাব মিলিয়ে চেক করে যে লেনদেনটি সঠিক কি না (যাকে Proof of Work বলা হয়)। নেটওয়ার্কের ৫১% এর বেশি কম্পিউটার যখন একমত হয় যে লেনদেনটি সঠিক, তখনই কেবল ওই ব্লকটি চেইনে যুক্ত হয়। একবার চেইনে যুক্ত হয়ে গেলে, পৃথিবীর কেউ আর ওই ডেটা মুছতে পারে না।
ব্লকচেইন কেন এত বেশি নিরাপদ? হ্যাক করা কি সম্ভব?
সাধারণ ব্যাংকের সার্ভার হ্যাক করা সম্ভব, কারণ তাদের সব ডেটা একটি নির্দিষ্ট সেন্ট্রাল সার্ভারে থাকে। হ্যাকার সেই একটি সার্ভার হ্যাক করলেই সব শেষ। কিন্তু ব্লকচেইন হলো 'ডিসেন্ট্রালাইজড' (Decentralized)। এর কোনো নির্দিষ্ট সার্ভার বা মালিক নেই। এর ডেটা লাখ লাখ কম্পিউটারে ছড়ানো থাকে।
কেউ যদি ব্লকচেইন হ্যাক করে কোনো ২ নম্বর ব্লকের ডেটা পরিবর্তন করতে চায়, তবে ওই ২ নম্বর ব্লকের হ্যাশ সাথে সাথে বদলে যাবে। যেহেতু ৩ নম্বর ব্লকে ২ নম্বরের পুরোনো হ্যাশ লেখা ছিল, তাই হ্যাশ না মেলায় ৩ নম্বর ব্লকটি অকেজো (Invalid) হয়ে যাবে। ফলে ৪, ৫, ৬ নম্বরসহ চেইনের সামনের সব ব্লক ভেঙে পড়বে।
হ্যাক করতে হলে হ্যাকারকে প্রতিটি ব্লকের হ্যাশ নতুন করে সলভ করতে হবে এবং একই সাথে নেটওয়ার্কের ৫১% কম্পিউটারে (লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার) ঢুকে একসাথে ডেটা পরিবর্তন করতে হবে, যা প্রযুক্তিগতভাবে এবং আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। এই ৫১% কম্পিউটার একসাথে হ্যাক করার তত্ত্বটিকে বলা হয় '51% Attack'।
ব্লকচেইনের বাস্তব ব্যবহার (ভবিষ্যতের পৃথিবী)
শুধু বিটকয়েন নয়, ব্লকচেইনের জাদুকরী ক্ষমতা আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যবহার করা সম্ভব:
১. ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ফাইন্যান্স:
বর্তমানে বিদেশ থেকে দেশে টাকা পাঠাতে গেলে ব্যাংক বা থার্ড-পার্টি অনেক টাকা চার্জ কাটে এবং ২-৩ দিন সময় লাগে। কিন্তু ব্লকচেইনের (বিটকয়েন/ইথেরিয়াম) মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশাল অংকের টাকা পাঠানো সম্ভব, তাও আবার প্রায় বিনা খরচে এবং কোনো ব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই।
২. স্মার্ট কন্ট্রাক্ট (Smart Contracts):
এটি হলো স্বয়ংক্রিয় চুক্তিপত্র। ধরুন, আপনি শর্ত দিলেন যে, আপনার ফ্লাইটের সময় ৫ ঘণ্টা পিছিয়ে গেলে আপনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। ব্লকচেইনে এই স্মার্ট কন্ট্রাক্ট একবার লেখা হয়ে গেলে, বিমান দেরি হওয়া মাত্রই কোনো উকিল বা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই আপনার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে আসবে।
৩. ডিজিটাল ভোটিং সিস্টেম (Secure Elections):
বর্তমান বিশ্বে ভোট জালিয়াতি একটি বড় সমস্যা। কিন্তু ভোট দেওয়ার সিস্টেম যদি ব্লকচেইনে নিয়ে আসা হয়, তবে মানুষ ঘরে বসে মোবাইল দিয়ে ভোট দিতে পারবে। একবার ভোট ব্লকচেইনে রেকর্ড হয়ে গেলে, স্বয়ং নির্বাচন কমিশন বা দেশের প্রধানমন্ত্রীও সেই ভোট পরিবর্তন বা ডিলিট করতে পারবে না।
৪. সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট (Supply Chain):
আপনি বাজার থেকে যে দামি ওষুধ বা আপেলটি কিনছেন, সেটি আসল নাকি নকল, তা ব্লকচেইনের মাধ্যমে খুব সহজেই ট্র্যাক করা যায়। ফ্যাক্টরিতে তৈরি হওয়া থেকে শুরু করে ট্রাকে করে আপনার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ ব্লকচেইনে রেকর্ড করা থাকে, যা কেউ জালিয়াতি করতে পারে না।
৫. স্বাস্থ্যখাত বা মেডিকেল রেকর্ড:
রোগীদের সব টেস্ট রিপোর্ট এবং মেডিকেল হিস্ট্রি ব্লকচেইনে সেভ করা থাকলে, পৃথিবীর যেকোনো দেশের ডাক্তার তা এক ক্লিকেই দেখতে পারবেন, আবার রোগীর প্রাইভেসিও ১০০% সুরক্ষিত থাকবে।
ব্লকচেইনের সুবিধা এবং অসুবিধা
সুবিধা:
- মাঝখানে কোনো থার্ড-পার্টি বা ব্যাংক থাকে না, তাই খরচ কম।
- ডেটা পরিবর্তন বা হ্যাক করা সম্পূর্ণ অসম্ভব (Highly Secure)।
- সবার জন্য উন্মুক্ত (Transparent), তাই দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ নেই।
অসুবিধা:
- মাইনিং করার জন্য প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
- এটি এখনো অনেক ধীরগতির। ভিসা (Visa) কার্ড যেখানে সেকেন্ডে ২৪ হাজার ট্রানজেকশন করতে পারে, সেখানে বিটকয়েন ব্লকচেইন সেকেন্ডে মাত্র ৭টি ট্রানজেকশন করতে পারে (যদিও আধুনিক ব্লকচেইনগুলো স্পিড বাড়ানোর চেষ্টা করছে)।
শেষ কথা
"ব্লকচেইন (Blockchain) কী?" — আশা করি এই সহজ এবং বিস্তারিত আর্টিকেলের মাধ্যমে আপনি প্রযুক্তির এই যুগান্তকারী বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন। ইন্টারনেট যেমন আমাদের তথ্য আদান-প্রদানের জগতকে সহজ করে দিয়েছিল, ব্লকচেইন তেমনি আমাদের অর্থ এবং বিশ্বাস (Trust) আদান-প্রদানের জগতকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করে তুলবে। অদূর ভবিষ্যতে আমরা না চাইলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজেই ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার দেখতে পাবো।
প্রযুক্তি, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং বিজ্ঞানের এমন সব দারুণ এবং শিক্ষণীয় গাইড নিয়মিত পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন। আজকের এই জটিল বিজ্ঞানভিত্তিক আর্টিকেলটি যদি আপনি সহজভাবে বুঝতে পেরে থাকেন, তবে অবশ্যই আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাদেরকেও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। ব্লকচেইন বা ক্রিপ্টো নিয়ে আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট বক্সে জানাতে পারেন। এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ!



Infonestra Policy Accept and comment. Every comment is reviewed.
comment url